শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২০
দূর্যোগে নারী
এখন যে গল্পটা বলবো এটা আমাদের শহুরে উচ্চ শিক্ষিত সমাজের,যেখানে তারা দাবি করে তারা সব বিষয়ে সচেতন। আসলেই কি তাই?
লাবণ্য এই বাঙালি সমাজের উচ্চশিক্ষিত শহুরে পরিবারের এক মেয়ের নাম। যদিও নামটি ছদ্মনাম তবুও এই সমাজেরই একটি চরিত্র। গতকাল রাত হতেই লাবণ্যের পিরিয়ড শুরু হয়েছে আর এরমধ্যে সারা পৃথিবীজুড়েই করোনা আতংক।সে এক্টু বেশিই ভয় পেয়ে গেছে এবার কারণ গত ১০ দিন আগেই তার ঋতুচক্র শেষ হয়েছিল। হরমোলান ইমব্যালান্সের কারণে তাকে বেশ কয়েকবার এইরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেসময় দেশের পরিস্থিতি ভালো ছিল ডাক্তারকে দেখাতে পেরেছিল কিন্তু এই দূর্যোগের সময়ে কি করবে সে ভেবে পাইনা। এরমধ্যে মুড সুইং তো আছেই।এরমাঝে ঘরে সবাই বন্ধী।বাবা, বড় ভাই,এক চাচা ও বিপদে পড়ে এসেছে তাদের বাসায়।এতোসব লোকের প্রতিদিনের খাবার,সকাল দুপুর সন্ধ্যায় নাস্তা বানাতে বানাতে লাবণ্য ও তার মা গত দু সপ্তাহে প্রায় হাপিয়ে উঠেছে । এরমধ্যে লাবণ্য আবার পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।লাবণ্যের বড় ভাই এক সমাজ কল্যাণ সংস্থার বড় পদের কর্মকর্তা বাবা ও রিটায়ার্ড অফিসার,চাচা কাজে যদিও কিছু করেনা কিন্তু নিজেকে সমাজ উন্নয়ন কর্মী বলেই দাবি করে।এছাড়া নেট দুনিয়ায় তার ব্যাপক নামডাক মানবতাবাদী হিসেবে।আজ সকাল থেকে লাবণ্যের মুড সুইং, এর মধ্যেই তার বড় ভাই বলছে লাবণ্য সারাদিন করে কি নিজের রুমে কোন কাজকর্ম করেনা, কিছুই করেনা। আমাদের নাস্তাটা অন্তত বানাতে পারে।
ভাই আর চাচা এদের সারাদিনের কাজ খবর দেখা করোনায় কোন দেশে কতজন মরলো সেই খবর রাখা আর বেলা বারটার পর ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করা কয়েক পদের বাহারি নাস্তা দিয়ে তারপর খবর দেখা এরপর আবার দুপুরের কয়েক পদের খাবার খাওয়া এরপরে আবার খবর দেখা তারপর একটা হাল্কা ঘুম দিয়ে উঠে চা আর নাস্তা বিছানার পাশে তো চাই।এরপর দেশবিদেশের করোনার গল্প তো চলছেই রাত ১১ টা অব্ধি ড্রয়িং রুমে, তারপর আবার রাতের বাহারি দুই চার পদের রান্না দিয়ে ভূরিভোজন। এভাবেই কাটছে গত দুই সপ্তাহ। অথচ তাদের চোখেই পড়েনা এই কঠিন পরিস্থিতিতে ঘরে থাকা দুইজন নারীর উপর কি পরিমাণ কাজের চাপ,মানসিক চাপ যাচ্ছে।এতোবড় মস্তিষ্কে তাদের এই চিন্তা কোনদিন আসেনি,মনে হয় আসবেনা কোনদিন ও।লাবণ্য একদিন শুয়ে আছে শুনতে পেল তার চাচা বলছে বাসায় মেয়েদের কি আর কাজ রান্না করা এই আর কি,এ আর এমন কি কাজ।লাবণ্য বিছানা ছেড়ে উঠে এসে বললো তোমাদের যদি তাই মনে হয় একটা চ্যালেঞ্জ করি শুধুমাত্র আগামীকালের কাজগুলো তোমরা করবে আর আমরা দুজন রেস্ট করবো।আগপিছ চিন্তা না করে চাচা বললো ঠিক আছে এটা আর এমন কি কাজ।পরের দিন সকাল বেলা লাবণ্য এসে তাদের ডেকে দিল, তাদের তো মেজাজ চরমে এতো ভোরে কেউ ঘুম থেকে উঠে তখন কিন্তু সকাল নয়টা। লাবণ্য বললো চাচা, ভাইয়া, বাবা চ্যালেঞ্জের কথা ভুলে যেওনা। তিনজন মিলে চা আর নুডলস রান্না করতেই হিমসিম খেয়ে গেল।১১ টায় শেষ হলো নাস্তা পর্ব।এবার দুপুরের খাবার তিন পদের রান্না, ভাত ও রান্না করতে হবে।রান্না তো হলো কিন্তু তিনটে বেজে গেল তিন পুরুষের সব করতে করতেই।ভাই তো রেগে আগুন চাচার উপর কেন এই চ্যালেঞ্জ নিতে গেল।লাবণ্য তাদের স্মরণ করিয়ে দিল বিকেলের নাস্তা ও চা বানাতে হবে।খেয়েই তারা লেগে পড়লো নাস্তা বানাতে বিকেল পাঁচটায় নাস্তা হলো এরপর তারা ক্লান্ত এবং তারা স্বীকার করলো সত্যিই সংসারের অনেক কাজ যা একা নারীর উপর অনেক চাপ। তারা সিদ্ধান্ত নিল একসাথে তারা রান্না করবে শিফট করে তাহলে আর কারো উপর চাপ পড়বেনা।সমযোতায় সবাই হাসতে লাগল।এরমধ্যে লাবণ্যের ঘুমটা ভেংগে গেল।লাবণ্য এতোক্ষণ এই সমাজে সমতার স্বপ্ন দেখছিল।
এই কথা গুলো এই চ্যালেঞ্জটা সত্যিই যদি সে তার ঘরে থাকা অকালকুষ্মাণ্ড গুলোকে ছুঁড়ে দিতে পারতো,তাহলে কতো না ভালো হতো।কিন্তু পুরুষতান্ত্রিকতার ভয় তাকে সেই কথাগুলো, চ্যালেঞ্জ করার কথা বলার সাহস ও দিচ্ছেনা।এই চিত্র গল্প নয় এই চিত্র আমাদের শিক্ষিত সমাজের,আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের।আমরা কি পারিনা এই চিত্রটা লাবণ্যের স্বপ্নে দেখা সমতার গল্প করতে! আমরা কি পারিনা এই কঠিন দূর্যোগের মুহুর্তে ঘরের কাজগুলো ভাগাভাগি করে নারীর উপর অতিরিক্ত কাজের চাপ কমিয়ে তাকে মানসিক ও শারিরীক শান্তি দিতে।আমাদের এই পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষদের চোখ কবে খুলবে আমার জানা নেই,গত কয়েক সপ্তাহ ব্র্যাকের একটা রিসার্চ এর সার্ভে করতে গিয়ে আমার জেন্ডার লেন্সে উঠে এসেছে সমাজের এই চিত্র।এই চিত্র সারা শহরজুড়ে, প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারে নারী শারিরীকভাবে লাঞ্চিত না হলে ও মানসিকভাবে দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত। নিম্নমধ্যবিত্ত কিম্বা নিম্নবিত্ত সমাজে এই চিত্র যে কত করুণ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।রীতিমতো প্রতিদিন চলছে শারিরীক নির্যাতন, এরসাথে মেরিটাল রেপ তো প্রতিদিনের কাহিনী।বাকিসব ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুকের জন্যে হত্যা ও হয়রানির গল্প আমি নাইবা বললাম,সেই চিত্র আমরা পত্রিকার পাতা খুললেই দেখি।এই সমাজ কি বদলাবে? মানসিকতার পরিবর্তন কি আসবে আমাদের আচরণে? যদি না আসে এই সমাজে লাবণ্যরা আর স্বপ্ন দেখবেনা,উচ্চশিক্ষার জন্যে তারা যে স্বপ্ন দেখে সেটাও হবে দুঃস্বপ্ন। পরিবর্তন আনতে হলে আজ এখনই সময় পরিবর্তনের।আমরা পুরুষেরা চাইলেই একটা সুন্দর সমাজ এই বাংলাদেশকে উপহার দিতে পারি।সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি কি করবেন।
পরিশেষে বলতে চাই,,,
এমন একটি পৃথিবী আমাদের ও কাম্যযেখানে থাকবে সকলের সমতা ও সাম্য।।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
মা দিবসে উপলব্ধি
মা দিবসে উপলব্ধি-সুজন নীল আপনি যখন একা জীবন যাপন করবেন তখন অনুধাবন করবেন ঘরের কাজগুলো ফেলনা নয় এই রান্নাবান্না, থালাবাসন মাজা,কাপড়চোপড় ধ...
-
হিংসার পরিণাম সুজন নীল তোমাদের এই নষ্ট শহরে,আমি এক কষ্ট পথিক। চলতে গিয়ে বলতে কথা হয় লজ্জা শতধিক। সরু গলি, কানা গলি সবকিছু আজ রাজপথ ...
-
যদি আমি একটা পানিভর্তি গ্লাস হাতে নিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করি, এই গ্লাসের ওজন কত হতে পারে? আপনার উত্তর ৫০গ্রাম - ৫০০ গ্রাম, একটা হতে পারে। এই...
-
মা দিবসে উপলব্ধি-সুজন নীল আপনি যখন একা জীবন যাপন করবেন তখন অনুধাবন করবেন ঘরের কাজগুলো ফেলনা নয় এই রান্নাবান্না, থালাবাসন মাজা,কাপড়চোপড় ধ...
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন